পটিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে সেলিম চৌধুরী: ১ম পর্ব : ১৬৬৬ সালে মোগল বাহিনী বাহিনী চট্টগ্রাম বিজয়ের পর বুজর্গ উমেদ খান আধু খান ও সংগ্রাম সিংহকে দোহাজারির প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত করেন। তাঁরা দুজন প্রত্যেকে এক হাজারি মনসবদার হিসেবে দু’জনে দু’হাজারি মনসবদার ছিলেন। সেই থেকে দোহাজারি নামের উৎপত্তি । ৭১ থেকে মুক্তিযুদ্ধে আর দু’জন প্রহরী নিযুক্ত হন, তাঁরা হলেন আবু তাহের খান খসরু ও জাফর আলী হিরু, তাঁরা দোহাজারিকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। সেই দুর্গের প্রহরী ছিলেন চারজন-খসরু, হিরু, রতন, কামাল। খসরু, কামাল গত হয়েছেন। এখন হিরু, রতন জেগে আছেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জাফর আলী হিরু দোহাজারির একটি সংগ্রামী মুখ। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটি অগ্নিশিখা হয়ে ৭০ থেকে জ্বলছেন এবং এখনো জ্বলছেন। মুক্তবুদ্ধি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অতন্দ্র প্রহরী হিরু দোহাজারীতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুদের বিরুদ্ধে জিইয়ে রেখেছেন এবং সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ১৯৬৮ সালে আবু তাহের খান খসরু, জাফর আলী হিরু, অধ্যক্ষ ডা. রতন কুমার নাথ এবং কামালউদ্দিন দোহাজারীতে প্রথম ছাত্রলীগ ও ছাত্র রাজনীতির মশাল প্রজ্জ্বলিত করেন। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রচণ্ড উত্তাপে যখন ঢাকায় আগুন ধরে গিয়েছিল, দোহাজারিতেও সে আগুন জ্বলে উঠেছিলো। খসরু, হিরু, রতন, কামালরা দোহাজারিকে মিছিল-মিটিংয়ে মাতিয়ে তুলেছিলেন। তাঁরা ৭০-এর বঙ্গবন্ধু কক্সবাজার যাওয়ার পথে তাঁকে সংবর্ধনা দেন। ৭১-এর মার্চে দোহাজারীতে সংগ্রাম পরিষদ গঠনে তাঁরা উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করলে খসরু-হিরু-রতন-কামালরা দোহারীতে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য ছাত্র-জনতাকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেন, তাঁরা নিজেরাও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পাক বাহিনী শহর থেকে গ্রামে চলে আসলে তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ দুর্গম পার্বত্য পথে ভারতে গিয়ে ভারতীয় বাহিনীর কাছে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষেও দোহাজাররির প্রথম ও একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ নিয়ে এলাকায় এসে যুদ্ধ করেন। খসরু কমান্ডার, হিরুর ডেপুটি কমান্ডার।
বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক জাফর আলি হিরু ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানার দোহাজারী ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৃত আবদুল মুসা সওদাগর। তিনি দোহাজারীর একজন প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি নিজ গ্রাম দোহাজারীর হাজারী বাজারে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তাঁর দাদা মরহুম আবু তালেব।
জনাব জাফর আলি হিরু পিতামাতার প্রথম সন্তান, তাঁর আরো দু’ভাই এবং দু’বোন রয়েছে। ভাই মোহাম্মদ আলী রাজু, বিএ পাস (প্রয়াত)। বোন শাহীন আকতার ম্যাট্রিক পাস। সাতকানিয়া থানার মৈষামুড়া গ্রামের হাফেজ আহমদের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তিনি ছিলেন ব্যাংকার, মারা গেছেন। এরপর ভাই আজগর আলী সেলিম, ইন্টার পাস। তিনিও সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত। সর্বকনিষ্ঠ বোন পারভীন আকতার, ম্যাট্রিক পাস। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো রাঙ্গুনিয়ায়, সে বিয়ে টেকেনি।
জনাব জাফর আলি হিরু শৈশবে দোহাজারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে দোহাজারী জামিজুরি আর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে চন্দনাইশ গাছবাড়িয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন এবং ডিগ্রিতে ভর্তি হন। কিন্তু রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকায় সেসময় তিনি ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
জনাব জাফর আলি হিরু ছাত্র অবস্থায় বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পদাক মোহাম্মদ মুসা দোহাজারীর দরগাহ মাঠে ছাত্র ইউনিয়নের কমিটি গঠন করেন। সেখানে জাফর আলি হিরু, রফিক, আবু তাহের খান খসরু, অধ্যক্ষ রতন কুমার নাথ, আবুল বশর, মোজাহেরুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার ফজল করিম সহ অনেকেই ছিলেন। পরবর্তীকালে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের মাঝে সংঘাত বাধে রাজবন্দীদের মুক্তির বিষয়ে; ছাত্র ইউনিয়ন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মুক্তির দাবিতে মিছিল করছিল, অপরদিকে ছাত্রলীগ শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে সংগ্রাম করছিল।
১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ দোহাজারী ইউনিয়ন কমিটি গঠিত হয়। সে কমিটিতে রফিক আহমদ সভাপতি ও আবু তাহের খান খসরু সাধারণ সম্পাদক হন। জাফর আলি হিরু হন দপ্তর সম্পাদক। সে সময় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক ছিলেন স্বপন কুমার চৌধুরী। তাঁর বাড়ি ছিল সাতকানিয়ায়। সে সময় তাঁর মাধ্যমেই দোহাজারী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাথে যোগাযোগ রাখতেন।
পরবর্তীকালে জেলা ছাত্রলীগ নেতা এসএম ইউসুফ, পটিয়ার চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম খালেদ সহ অনেকের সাথে তাদের যোগাযোগ হয়। সেখানে শামসুদ্দিন আহমদ, মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, আবু সৈয়দ, মান্নান সহ অনেকের সাথে তাদের পরিচয় হয় এবং আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়।
পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের সাথে দোহাজারী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাহসী কর্মী জাফর আলী হিরুর যোগাযোগ হয়। সে সময় চট্টগ্রাম শহরে বিনোদা ভবন, স্বাধীনতার পর মনসুর ভবনে আবু তাহের খান খসরু, জাফর আলী হিরু সহ দোহাজারীর ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের যাতায়াত ছিল ।
সেখানে ছাবের আহমেদ আজগরী, মোখতর আহমদ, ইমামুল ইসলাম লতিফি, খায়রুল ইসলাম কক্সি, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, ডাক্তার মাহফুজুর রহমানসহ অনেকেই আসতেন।
১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে দোহাজারী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সম্মেলনে নতুন কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটিতে আবু তাহের খান খসরু সভাপতি ও জাফর আলি হিরু সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কামাল উদ্দিন সহ সভাপতি ও অধ্যক্ষ রতন কুমার নাথ সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে গণআন্দোলনে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে দোহাজারী ছাত্রলীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবু তাহের খান খসরুর নেতৃত্বে জাফর আলি হিরু সহ ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ সেসময় আন্দোলন সভা সমাবেশে অংশগ্রহণ করতেন।
পরবর্তীকালে তারা ইয়াহিয়া খানের মার্শাল ল বিরোধী আন্দোলন করেন। সে সময়ে রেল চলাচল বন্ধের কারণে অনেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে মামলা দেয়া হয়েছিল। মার্শাল ল’ কোর্টে তাদের ডাকা হয়েছিল কিন্তু জাফর আলি হিরু সহ ছাত্রলীগ নেতা নেতৃবৃন্দ এতে সাড়া দেননি। তারা মার্শাল’ ল কোর্টে উপস্থিত হননি।
পরবর্তীকালে চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের সম্মেলনের আয়োজন করা হয় মুসলিম হল-এ। সে সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন কিন্তু পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে ছাত্রলীগের সমাবেশ করতে দেয়নি। তখন বঙ্গবন্ধু শাহজাহান হোটেলে যান এবং এর বিরুদ্ধে সাংবাদিক সম্মেলন করেন। ছাত্রলীগের সম্মেলনে জনাব জাফর আলি হিরু দোহাজারী থেকে ছাত্রদের নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই তিনি প্রথম বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখেন। এরপর বঙ্গবন্ধুকে দ্বিতীয়বার দেখেন আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রলীগের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে, যেখানে বঙ্গবন্ধুকে তোফায়েল আহমদ ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে পটিয়ায় জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন অধ্যাপক নূরুল ইসলাম চৌধুরী ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন পান ডাক্তার বি এম ফয়েজুর রহমান। সে নির্বাচনে জাফর আলি হিরু ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে নিরলস পরিশ্রম করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ী করে এনেছিলেন। তারা গ্রামে-গঞ্জে বাড়িতে বাড়িতে সেসময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জন্য জনগণের কাছে ভোট চেয়েছেন। পোস্টার-লিফলেট বিতরণ করেছেন। নির্বাচন পরিচালনার জন্য যে কমিটি গঠিত হয়েছিলো, তাতেও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের প্রাধান্য ছিলো। আবু তাহের খান খসরু, জাফর আলি হিরু, কামাল উদ্দিন, অধ্যক্ষ রতন কুমার নাথ, আবুল বশর, আবদুস শুক্কুর প্রমুখ ছাত্রনেতা নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ছাত্রলীগই নির্বাচন পরিচালনা করেছিলো। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে দোহাজারী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন বজলুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ইসহাক ফকির।
১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধু সাংগঠনিক সফরে কক্সবাজার আসেন। ফেরার পথে আবু তাহের খান খসরুর নেতৃত্বে জাফর আলি হিরুসহ ছাত্রলীগ কর্মীরা দোহাজারীতে বঙ্গবন্ধুকে ফুলের মালা দিয়ে সংবর্ধনা দেন।
মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত দোহাজারীতে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সহায়তা করতেন জনাব আবদুল হক। সে সময় দোহাজারীতে সারের গুদাম ছিল, সেখানে তিনি স্টোর কিপার ছিলেন। আবদুল হক এর বাড়ি গোপালগঞ্জ। তাঁর সাথে বঙ্গবন্ধুর খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনি দোহাজারীতে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতেন।
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। দোহাজারীতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সে আন্দোলন সফল করতে ট্রেন-বাস চলাচল বন্ধ করে দেন, রাস্তাঘাট অবরোধ করেন, অফিস-আদালত সব বন্ধ করে দেন। দোহাজারীর বাজারে বাজারে মাইক লাগিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করেন। ৮ মার্চ সকালে রেডিও থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা হলে দোহাজারীতে সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে মাইক লাগিয়ে ভাষণ প্রচার করা হয়। ছাত্রনেতা আবু তাহের খান খসরু সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অধ্যক্ষ রতন কুমার নাথ, কামাল উদ্দিন এবং আরো অনেকে সংগ্রাম কমিটির সদস্য ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়ন থেকেও সদস্য ছিলো। দোহাজারী পুরাতন ইউনিয়ন কাউন্সিল ভবন ছিলো সংগ্রাম কমিটির অফিস। লেখক নাছির উদ্দীন চৌধুরী।